গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাঁচ শীর্ষ কোম্পানির নাম

বাজারে সংকট সৃষ্টিতে এলপিজি মজুত!

নিজস্ব প্রতি‌বেদক

সরকার নির্ধারিত মূল্যকে পাশ কাটিয়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে জ্বালানী গ্যাস বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ ব্যাপারে সরবরাহ শৃখলের মাঝামাঝি পর্যায়ে (ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা) অনেক সময় গ্যাস মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার জমা দেওয়া প্রতিবেদনে পাঁচটি শীর্ষ কোম্পানির বিরুদ্ধে আমদানি করা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) মজুত করে রাখার অভিযোগ তুলে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে। কোম্পানীগুলির মধ্যে রয়েছে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনার নাম। প্রায় ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করা এলপিজি বাজারে ছাড়েনি বলে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দেশের অনেক এলাকায় বর্তমানে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে সতের শ’ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অথচ সেপ্টেম্বরের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে শুধু আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় নিলে দেশজুড়ে সরবরাহে ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি (খচএ) বা রান্নার গ্যাস বিক্রি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সরবরাহ শৃখলজনিত (ংঁঢ়ঢ়ষু পযধরহ) কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- উৎপাদক বা আমদানিকারকদের কাছ থেকে চূড়ান্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর মাঝে একাধিক পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা থাকে। এই দীর্ঘ নেটওয়ার্কে লাভাংশের হাতবদল এবং নিয়ন্ত্রণহীন কমিশন নির্ধারণের কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম অনেক বেড়ে যায়।

অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সরবরাহ কম দেখিয়ে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগ নিয়ে তারা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে কঠোর ও নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় অনেক খুচরা বিক্রেতা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার সাহস পায়। জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যব¯ার ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।

পাশাপাশি মহল্লা বা গ্রামপর্যায়ে অনুমোদনহীন অনেক দোকানদার সিলিন্ডার বিক্রি করে। কোনো নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করায় তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো লাভ ধরে গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করে।

এনএসআই এর প্রতিবেদনে এবার থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি করা এলপিজি মজুত রাখা হয়ে থাকতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি না করার বিষয়ে সতর্ক করে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) দেওয়া বিজ্ঞপ্তির তথ্যের সঙ্গে এই পরিসংখ্যান মিল চোখে পড়েছে।

এনএসআই এর প্রতিবেদনে আমদানি করা এলপিজি বাজারে না ছাড়ার অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে বাজারে প্রতি টনে মার্কেট প্রিমিয়াম প্রায় ৬৪ ডলার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এর সময় মিলে যাওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজি ইচ্ছাকৃতভাবে মজুত রেখে দাম সমন্বয়ের পর বাজারে ছাড়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সরকারকে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন ঘটনা প্রমাণিত হলে তা আমদানিকারকদের বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ সীমিত করে দাম বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এনএসআই বাজার পরিস্থিতি সংকটজনক বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, সরবরাহব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে থাকা অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাড়তি দামের চাপ যুক্তিসংগতভাবে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই চাপ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমস্যা তৈরি করছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

দাম বাড়ার পেছনে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি দায়ী, নাকি মজুত ধরে রাখা, আমদানি করা এলপিজি দেরিতে বাজারে ছাড়া বা অন্য কোনো বাজারচর্চা রয়েছে, তা নির্ধারণ করতে সরকারকে তাগিদ দিয়েছে এনএসআই।

সংস্থাটি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধান আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুত জরুরিভাবে নিরীক্ষার অনুরোধ করেছে। এ জন্য আমদানিকারকভিত্তিক এলপিজির চালান আসা, খালাস, সংরক্ষণ, মজুতের পরিমাণ ও প্রকৃতপক্ষে বাজারে ছাড়ার তারিখের তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মজুতের পরিমাণ স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রয়োজন ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়নেরও অনুরোধ করেছে এনএসআই।

বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন আমদানি করা এলপিজির চালান আসা, মজুত ও বাজারে ছাড়ার তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি কোনো কর্মকা- স্বাভাবিক সরবরাহ সীমিত করেছে বা অস্বাভাবিক দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

পর্যাপ্ত আমদানি করা এলপিজি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেও সরকারকে তাগিদ দিয়েছে তারা। সংস্থাটি বলেছে, অতিরিক্ত মজুত ধরে রাখার মাধ্যমে যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি বা বাজারের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা না যায়।

এরই মধ্যে সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে লোয়াব।

এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, এলপিজি আমদানি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে, তা চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই।

লোয়াব সতর্ক করে বলেছে, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বা অনুমোদনহীন মজুত করলে অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার কিংবা খুচরা বিক্রেতারা বিদ্যমান আইন লঘন করবেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ওমেরা পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যিক লাভের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আমদানি করা এলপিজি আটকে রাখা বা বাজারে সরবরাহ সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘ওমেরা সব সময় বাংলাদেশে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং তা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যাওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।’

প্রতিবেদনে নাম থাকা আরেকটি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওই কোম্পানিতে উল্লেখযোগ্য বিদেশি মালিকানা রয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন